দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন সামরিক হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার উদ্বেগের মধ্যে ইরানে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব ও মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। সোমবার তেহরানে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে সৌদি যুবরাজের ভাই ও দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে যোগ দেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। তাঁরা ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানেরসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নতুন করে হামলার নির্দেশ দিতে পারেন—এমন জল্পনার মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। গত মাসে ইরানের মদদপুষ্ট ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা জোরদার করার পর ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রায়েদ ক্রিমলি জানান, চলমান সংকটে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের বিষয়টি বৈঠকে আলোচনার কথা রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এ আলোচনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাঘাই বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছি, অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সদিচ্ছা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের ওপর নির্ভর করতে হবে।’
মক্কা জোটের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্প্রতি গঠিত ‘মক্কা জোট’-এর সদস্য। অঞ্চলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে নিয়ে গঠিত এ জোটের নীতিমালা অনুযায়ী, একজন সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান, তুরস্কের সামরিক শক্তি ও সৌদি আরবের আর্থিক সামর্থ্যকে একত্র করার কারণে জোটটি নজর কেড়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি সিএনএনকে বলেন, ‘এই বৈঠকের গুরুত্ব মূলত এর সময়কাল ও অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের কারণে। এমন এক সময়ে এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি বাড়ছে। মক্কা চুক্তির তিন সদস্যেরই এ পরিস্থিতিতে সরাসরি নিরাপত্তাস্বার্থ জড়িত।’
সৌদি আরবের কার্যত নেতা ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাই প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের তেহরান সফর পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে। সৌদি আরব ও ইরান কয়েক দশক ধরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িত। দুই দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শেও পার্থক্য রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে দুই দেশের বিরোধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বড় অংশ এবং কয়েকজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জবাবে ইরান সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ইরানের মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে ইরাক ও ইয়েমেনে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোও সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আট মাস ধরে চলা অস্থিতিশীলতার পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালালে তেহরানের পাল্টা আঘাত আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বিগ্ন এ অঞ্চলের দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি
সিএনএনের বরাতে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য হামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন অভিযান শুধু ইরানের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও দ্রুত পুনর্গঠনযোগ্য সামরিক স্থাপনায় হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
গত কয়েক মাসে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তীব্রতা কমিয়েছে। এর পরিবর্তে বিশ্বে প্রতিদিন পরিবাহিত মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহনকারী জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইরান এ অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ড থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে এবং প্রতিরক্ষার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের সামরিক বাহিনী মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু দেশ ধীরে ধীরে অস্ত্রের উৎসে বৈচিত্র্য আনছে এবং নতুন সামরিক জোট গড়ছে।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিত্রিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মক্কা জোট বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টার অংশ, যার লক্ষ্য আরও বেশি স্বনির্ভরতা।
তিনি আরও বলেন, ‘তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু ইরানের শাসনব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয় নয়, বরং ইরান যে এখনো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং তার প্রভাব উপেক্ষা করা সম্ভব নয়—সেই উপলব্ধিরও প্রতিফলন।’
নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরানের কর্মকর্তারা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফসহ কেউ কেউ মনে করছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এ উদ্যোগকে এখনই বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন না আইসিজির বিশ্লেষক আজিজি।
তিনি বলেন, তেহরান এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা চায়, যাতে কোনো চুক্তি হলে ভবিষ্যতে আবার সামরিক হামলা না হয়। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তান কীভাবে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারে কিংবা ট্রাম্পের ওপর যথেষ্ট প্রভাব খাটিয়ে তা নিশ্চিত করতে পারে, তা স্পষ্ট নয়।
আজিজি আরও বলেন, ‘তেহরান বা ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে—এমন নতুন কোনো প্রস্তাব এসব দেশ সামনে আনতে না পারলে বৈঠক থেকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসার সম্ভাবনা কম। আপাতত এটিকে নতুন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা না বলে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়া ঠেকাতে শেষ মুহূর্তের একটি প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।’
সূত্র: সিএনএন
এমএস/